উপাচার্য ছাড়াই চলছে ৩৯ বেসরকারি বিশ্বদ্যালয় । ছবি: সংগৃহীত
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ প্রশাসনিক সংকটের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য বলছে, অনুমোদিত ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৯টিতে বর্তমানে কোনো উপাচার্য (ভিসি) নেই। একই সঙ্গে ৯৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) এবং ৪৭টিতে কোষাধ্যক্ষের (ট্রেজারার) পদ শূন্য রয়েছে। এতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, একাডেমিক কার্যক্রম ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বছরের পর বছর ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায়, আবার কোথাও অনুমোদনের পরও দায়িত্ব গ্রহণ না করায় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য রয়েছে। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এগুলো হলো— ইবাইস ইউনিভার্সিটি, দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা, আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি এবং কুইন্স ইউনিভার্সিটি। এছাড়া অনুমোদন পেলেও এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি আরও তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়।
ইউজিসির তালিকায় ভিসিবিহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, সাউদার্ণ ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
তবে ইউজিসির তালিকায় থাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ইতোমধ্যে নতুন উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অধ্যাপক ড. মো. আমানউল্ল্যাহকে উপাচার্য এবং মেজর জেনারেল সাহেদুল ইসলামকে কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ইউজিসির তথ্য হালনাগাদের পর এই নিয়োগ কার্যকর হয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সুপারিশ করা তিনজন প্রার্থীর মধ্য থেকে আচার্য ও রাষ্ট্রপতি উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেন। এই তিনটি পদ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে এসব পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকলে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আইন অনুযায়ী উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেতে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ১০ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাসহ মোট ২০ বছরের একাডেমিক বা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। প্রো-ভিসি ও কোষাধ্যক্ষের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত অভিজ্ঞতার শর্ত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শীর্ষ পদগুলো দীর্ঘদিন খালি থাকার পেছনে নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে জটিলতা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং কিছু ক্ষেত্রে ট্রাস্টি বোর্ডের অতিরিক্ত প্রভাব অন্যতম কারণ। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণকালীন কর্মকর্তা নিয়োগের পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় আগ্রহী হওয়ায় সংকট আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
শিক্ষা অধিকার সংসদের সদস্য সচিব এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দনের মতে, উপাচার্য ও প্রো-ভিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকলে শিক্ষাদান, গবেষণা, মান নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষক মূল্যায়ন এবং একাডেমিক পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতেও জবাবদিহিতার ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করতে ইউজিসিকে আরও কার্যকর নজরদারি করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ প্রশাসনিক পদ পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের কার্যক্রম ও পরিচালন সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়নেরও প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে ইউজিসির সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণে কমিশন সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে। প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে ধাপে ধাপে সমস্যার সমাধানে কাজ চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
