লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামাল। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপ মানেই নতুন নায়ক জন্ম নেয়ার মঞ্চ, আবার পুরোনো কিংবদন্তিদের রেকর্ড ভাঙার গল্পও। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে আলোচনায় শুধু শিরোপার লড়াই নয়, ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানোর দৌড়ও। লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে, লামিনে ইয়ামাল থেকে শুরু করে থিবো কোর্তোয়া অনেক তারকার সামনেই অপেক্ষা করছে দুর্লভ সব কীর্তি।
নিচে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো সেসব সম্ভাব্য রেকর্ডের গল্প।
সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হওয়ার অপেক্ষায় ডিক অ্যাডভোকাট
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হিসেবে মাঠে নামার রেকর্ড এখনো জার্মান কোচ অটো রেহগেলের দখলে। ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে গ্রিসের দায়িত্বে থেকে ৭১ বছর বয়সে তিনি এই কীর্তি গড়েন।
তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে। কুরাসাওয়ের ডাচ কোচ ডিক অ্যাডভোকাট তখন থাকবেন ৭৮ বছর বয়সে। তার নেতৃত্বেই জনসংখ্যার বিচারে ক্ষুদ্রতম দেশগুলোর একটি কুরাসাও বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে। এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ হুগো ব্রোসের বয়সও তখন ৭৪ বছর ছাড়িয়ে যাবে।
পেপের রেকর্ড কি কেড়ে নেবেন রোনালদো?
২০২২ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতার রেকর্ড গড়েন পেপে। তখন তার বয়স ছিল ৩৯ বছর ২৮৩ দিন। ২০২৬ বিশ্বকাপে এই রেকর্ডের সবচেয়ে বড় দাবিদার তারই জাতীয় দলের সতীর্থ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তখন রোনালদোর বয়স হবে ৪১ বছর।
রেকর্ডটির জন্য লড়াইয়ে আছেন ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদরিচ এবং বসনিয়া-হার্জেগোভিনার এডিন জেকোও। তবে নকআউট পর্বে গোল করার সুযোগটিই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
হেলমুট শোনের ম্যাচের রেকর্ডের সামনে দেশম
জার্মানির সাবেক কোচ হেলমুট শোন ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করে কোচ হিসেবে সর্বোচ্চ ২৫ ম্যাচে ডাগআউটে দাঁড়ানোর রেকর্ড গড়েন। ১৯৭৪ সালে তিনি পশ্চিম জার্মানিকে বিশ্বকাপও জেতান।
ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশমের সামনে এবার সেই রেকর্ড ছোঁয়ার সুযোগ। বর্তমানে বিশ্বকাপে কোচ হিসেবে দেশমের ম্যাচ সংখ্যা ১৯। ফ্রান্স যদি ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে, তাহলে তিনি শোনের রেকর্ড স্পর্শ করবেন। আর আরও এগোতে পারলে নতুন ইতিহাস লিখবেন।
শুধু ম্যাচ নয়, কোচ হিসেবে সবচেয়ে বেশি জয় (১৬) পাওয়ার রেকর্ডটিও শোনের। দেশমের জয় এখন ১৪টি। অর্থাৎ আর তিনটি জয় তাঁকে এনে দিতে পারে আরেকটি রেকর্ড।
লামিনে ইয়ামালের সামনে রোনালদো নাজারিওর কীর্তি
১৯৯৮ বিশ্বকাপে মাত্র ২১ বছর বয়সে গোল্ডেন বল জিতে ইতিহাস গড়েছিলেন ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও। ফ্রান্সের কাছে ফাইনাল হারলেও তার পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ।
এই রেকর্ড এখন হুমকির মুখে। স্পেনের বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামালের বয়স ২০২৬ বিশ্বকাপে হবে মাত্র ১৮ বছর। ফ্রান্সের তরুণ তারকা দেজিরে দুয়ের বয়স হবে ২০। নিজ নিজ দলকে কাঙ্ক্ষিত জায়গা পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারলে তাদের কারও হাতেই উঠতে পারে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার।
ক্লোসার সবচেয়ে বেশি জয়ের রেকর্ডে মেসির চোখ
জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসা শুধু বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাই নন, খেলোয়াড় হিসেবে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়ের রেকর্ডও তার দখলে। ২৪ ম্যাচে ক্লোসার জয় ১৭টি।
অন্যদিকে লিওনেল মেসির বিশ্বকাপে ম্যাচ ২৬টি, জয় ১৬টি। অর্থাৎ গ্রুপ পর্বেই আর দুটি জয় পেলে ক্লোসাকে ছুঁয়ে ফেলবেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির অর্জনের তালিকায় যুক্ত হতে পারে আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায়।
ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড কি টিকবে?
বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড এক যুগ ধরে অটুট। তবে এবার সবচেয়ে বড় হুমকি দুই মহাতারকা।
লিওনেল মেসির গোল ১৩টি। অর্থাৎ রেকর্ড ছুঁতে প্রয়োজন তিন গোল, আর ভাঙতে চারটি। আরও ভয়ংকর অবস্থানে আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। মাত্র ১৪ ম্যাচে তার গোল ১২টি। বয়স ও ধারাবাহিকতা বিবেচনায় ক্লোসার রেকর্ড ভাঙার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা অনেকের চোখে ফরাসি এই ফরোয়ার্ডই।
বদলি হিসেবে সর্বোচ্চ ম্যাচের রেকর্ডে রাশফোর্ড
ব্রাজিলের সাবেক উইঙ্গার দেনিলসন বিশ্বকাপে ১২ ম্যাচ খেলে ১১ বারই বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন। এটাই এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ইংল্যান্ডের মার্কাস রাশফোর্ড ইতোমধ্যে ৯ বার বদলি হিসেবে খেলেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের পরিকল্পনায় থাকলে খুব সহজেই তিনি এই রেকর্ড নিজের করে নিতে পারেন।
কোর্তোয়ার সামনে শিলটন-বার্থেজের ক্লিন শিট রেকর্ড
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ক্লিন শিটের রেকর্ড যৌথভাবে ধরে রেখেছেন ইংল্যান্ডের পিটার শিলটন ও ফ্রান্সের ফাবিয়েন বার্থেজ। দুজনেরই ক্লিন শিট ১০টি।
বেলজিয়ামের গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়ার ক্লিন শিট এখন ৭টি। বিশ্বকাপে তার ম্যাচ সংখ্যা ১৫। বেলজিয়াম যদি নকআউট পর্যন্ত যেতে পারে এবং কোর্তোয়া নিজের সেরা ছন্দে থাকেন, তাহলে এই রেকর্ডও নতুন মালিক পেতে পারে।
কাফুর তিন ফাইনালের রেকর্ডের সামনে মেসি ও এমবাপ্পে
ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফু ১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০২ টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেছেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি অনন্য এক রেকর্ড।
লিওনেল মেসি খেলেছেন ২০১৪ ও ২০২২ ফাইনালে। কিলিয়ান এমবাপ্পেও ছিলেন ২০১৮ ও ২০২২ ফাইনালে। আর্জেন্টিনা কিংবা ফ্রান্স যদি ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছায়, তাহলে তারা কাফুর রেকর্ড স্পর্শ করবেন। আর জিতলে যোগ হবে নতুন গৌরবও।
বাতিস্তুতার হ্যাটট্রিকের রেকর্ড কি ভাঙবে?
আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা একমাত্র ফুটবলার হিসেবে দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করেছেন। ১৯৯৪ সালে গ্রিসের বিপক্ষে এবং ১৯৯৮ সালে জ্যামাইকার বিপক্ষে।
এই রেকর্ড ভাঙার সুযোগ রয়েছে হ্যারি কেইন, কিলিয়ান এমবাপ্পে, গনসালো রামোস ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সামনে। কারণ, তারা প্রত্যেকেই অন্তত এক বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করেছেন।
বিশেষ করে এমবাপ্পের সামনে রয়েছে আরও বিরল এক কীর্তির হাতছানি। ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করা এই ফরোয়ার্ড ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই যদি আবার তিন গোল করেন, তাহলে গার্ড মুলার ও স্যান্ডর ককসিসের পর টানা দুই বিশ্বকাপ ম্যাচে হ্যাটট্রিক করা মাত্র তৃতীয় ফুটবলার হবেন তিনি।
