ছবি: সংগৃহীত
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে ভাঙনের জল্পনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। দলীয় বৈঠকে বিধায়কদের কম উপস্থিতি, দুই বিধায়কের বহিষ্কার এবং ‘আসল তৃণমূল’ নিয়ে নতুন আলোচনা রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অনেকের মতে, পরিস্থিতি মহারাষ্ট্রের শিবসেনা বা এনসিপির বিভক্তির ঘটনার মতো মোড়ও নিতে পারে।
মূলত নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর মহারাষ্ট্রের শিবসেনার মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দলটি দুই ভাগে বিভক্ত হতে পারে বলে আলোচনা চলছে রাজনৈতিক মহলে। ‘আসল তৃণমূল’ বনাম ‘তৃণমূল’— এমন বিভাজনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকে। এর মধ্যেই দলের দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে বহিষ্কার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস।
এদিকে দলের ভাঙনের আশঙ্কার মধ্যেই রোববার কালীঘাটের বাসভবনে জয়ী বিধায়কদের নিয়ে বৈঠক ডাকেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২১ জন বিধায়ক। বৈঠকে অনুপস্থিতদের উদ্দেশে ক্ষোভ প্রকাশ করে তাদের ‘মীরজাফর’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সূত্রের খবর, একই সময়ে শহরের একটি হোটেলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের নিয়ে পৃথক বৈঠক করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও প্রথম দফার বৈঠকের পর কয়েকজন বিধায়ক সরে দাঁড়ান। তাদের বক্তব্য, তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গ ছাড়তে চান না।
তবে দলের একটি অংশের মধ্যে দুর্নীতির বিভিন্ন মামলাকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতিতে মমতার সঙ্গে থাকলে আইনি জটিলতা বাড়তে পারে। এ কারণেই কিছু নেতা বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থানের কথাও ভাবছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
মূলত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত কয়েক বছর ধরে ‘কালীঘাট বনাম ক্যামাক স্ট্রিট’ এবং ‘নবীন বনাম প্রবীণ’ দ্বন্দ্বের আলোচনা বারবার সামনে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে ‘আমরাই আসল তৃণমূল’ স্লোগান তুলে দলের একটি অংশ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
ক্ষমতায় থাকার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা দলীয় বৈঠকে প্রায় শতভাগ উপস্থিতি দেখা যেত। কিন্তু নির্বাচনে পরাজয়ের পর পরিস্থিতি বদলেছে। সাম্প্রতিক কোনও বৈঠকেই দলের ৬০ শতাংশ বিধায়ক উপস্থিত হননি। এর মধ্যেই দল ভেঙে নতুন সমীকরণ তৈরির জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সরাসরি বিজেপিতে যোগ না দিয়েও মহারাষ্ট্রে একনাথ শিন্ডে বা অজিত পাওয়ারের মতো আলাদা গোষ্ঠী গড়ে তোলার পথ বেছে নিতে পারেন কিছু নেতা। সে কারণেই তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
এই জল্পনার অন্যতম কারণ বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক। তৃণমূলের পক্ষ থেকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনীত করার যে চিঠি জমা দেয়া হয়েছিল, তাতে একাধিক বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় কয়েকজন বিধায়কের বাড়িতে তদন্তকারীরা গিয়েছেন। এমনকি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গেও তদন্তকারীরা যোগাযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, জাল স্বাক্ষরের অভিযোগ নিয়ে বিধানসভায় লিখিত অভিযোগ করেছিলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। এরপরই তাদের বহিষ্কার করে তৃণমূল।
এরপর সোমবার বিকেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেন। তিনি বলেন, কিছু নেতা বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দলের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছেন। তাদের বিরুদ্ধে দল ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাজনীতির ইতিহাসে দল ভাঙা বা নতুন দল গঠনের ঘটনা নতুন নয়। একসময় কংগ্রেস ভেঙেই তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে তুলেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দলটি মাত্র ২৮ বছরে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর সেই দল এখন অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে।
বর্তমানে ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে একটি অংশ বিদ্রোহী অবস্থানে রয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই সমীকরণ কোন দিকে যায়, সেটিই এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন।
